The opening page of Sukumar Ray's play লক্ষ্মণের শক্তিশেল in print - set in two columns of Bengali type.

লক্ষ্মণের শক্তিশেল (তৃতীয় দৃশ্য) · Lakshmaner Shaktishel (Scene Three)

তৃতীয় দৃশ্য

রামচন্দ্রের শিবির

রাম, বিভীষণ ও জাম্বুবান

রাম। কিছু আগে একটা গোলমাল শোনা যাচ্ছিল—বোধ হয় কোথাও যুদ্ধ বেধে থাকবে।

বিভীষণ। তা হবে!

খোঁড়াইতে-খোঁড়াইতে ব্যাণ্ডেজবদ্ধ সুগ্রীবের সকাতর প্রবেশ

বিভীষণ। আরে ও পালোয়ানজি, একি হল—ষাট ষাট ষাট।

সকলের উচ্চহাস্য

রাম। কি হে সুগ্রীব, তোমার যে দেখছি বহ্বারম্ভে লঘু ক্রিয়া হল।

বিভীষণ। আজ্ঞে, বজ্র আটুনি ফসকা গেরো—

রাম। যত তেজ বুঝি তোমার মুখেই।

জাম্বুবান। আজ্ঞে হ্যাঁ, মুখেন মারিতং জগৎ—

রাম। আমি বলি কি তুমি মস্ত যোদ্ধা।

জাম্বুবান। যোদ্ধা বলে যোদ্ধা—ঢাল নেই তলোয়ার নেই খামচা মারেঙ্গা।

বিভীষণ। আমি বরাবরই বলে আসছি—

সুগ্রীব। দ্যাখ! তোর ঘ্যানঘ্যানানি আমার ভালো লাগে না—

রাম। রাবণের কেন বল এত বাড়াবাড়ি?—পিঁপড়ের পাখা উঠে মরিবার তরে। জোনাকি যেমতি হায়, অগ্নিপানে

রুষি

সম্বরে খাদ্যোত লীলা—

জাম্বুবান। আজ্ঞে ঠিক কথা রাঘব বোয়াল যবে লভে অবসর বিশ্রামের তরে–তখনি তো মাথা তুলি চ্যাং পুঁটি যত করে মহা আস্ফালন।

বাহিরে গোলমাল

রাম। এত গোলমাল কিসের হে?

সুগ্রীব। রাবণ ইদিকে আসছে না তো?

জাম্বুবান ও বিভীষণ। অ্যাঁ-রাবণ আসছে—অ্যাঁ?

বিভীষণ। আমার ছাতাটা কোথায় গেল? ব্যাগটা?

জাম্বুবান। হ্যাঁরে তোর গায়ে জোর আছে? আমায় কাঁধে নিতে পারবি?

জাম্বুবানের বিভীষণের কাঁধে চাপিবার চেষ্টা ও দূতের প্রবেশ

দূত। শ্রীমান লক্ষ্মণ আসছেন।

সকলে আশ্বস্ত

রাম। এত হল্লা করে আসছে কেন? চেঁচাতে বারণ কর।

দূত। আজ্ঞে, তিনি আসছেন ঠিক নয়—তবে হ্যাঁ, একরকম আসছেনই বটে—মানে তাঁকে নিয়ে আসছে।

জাম্বুবান। লোকটার কান মলে তাড়িয়ে দাও তো—ব্যাটা হেয়ালি পাকাবার আর জায়গা পায় নি!

লক্ষ্মণকে ধরাধরি করিয়া সকলের প্রবেশ ও গান

বললেন যাহা জাম্বুবান (সাবাস গণৎকার হে)
আনুপূর্বিক ঘটল তাহা শুনতে চমৎকার হে।
পড়লেন লক্ষ্মণ শক্তিশেলে (যেন) ঝড়ে কলাগাছ রে—
খাবি খেতে লাগলেন যেন ড্যাঙায় বোয়াল মাছ রে!
অনেক কষ্টে রইল বেঁচে–(আহা) কপাল জোরে মৈল না—
(ওরে) স্বর্গ হৈতে কিচ্ছু তবু পুষ্পবৃষ্টি হৈল না!
ভাগ্যে মোরা সবাই সেথা ছিলাম উপস্থিত গো—
তা নৈলে তো ঘটত আজি হিতে বিপরীত গো!

রাম। হায়, হায়, হায়, হায়—হায় কি হল, হায় কি হল, হায় কি হল, হায় হায় হায়—

রামের মূর্ছা

বানরগণ। হায়-হায়-হায়-হায়-হায়-হায়, হায়-হায়-হায়-হায়-হায়-হায়, হায় কি হল-হল-হল-হল, হায় কি হল-হল-হল -হল-হল (ইত্যাদি)।

বানরগণের মাঝেমাঝে কলাভক্ষণ

জাম্বুবান। এতগুলো লোক কি সেখানে ঘোড়ার ঘাস কাটছিল নাকি?

সুগ্রীব। হনুমান ব্যাটা কি কচ্ছিল?

হনুমান। আমি বাতাসা খাচ্ছিলাম।

সুগ্রীব। ব্যাটা, তুমি বাতাসা খাওয়ার আর সময় পাও নি?

সুগ্রীবের গান

শোন রে ওরে হনুমান
হও রে ব্যাটা সাবধান
আগে হতে পষ্ট ব’লে রাখি।
তুই ব্যাটা জানোয়ার
নিষ্কর্মার অবতার
কাজে কর্মে দিস বড় ফাঁকি৷
কাজ কর্ম ছেড়ে ছুড়ে
ঘুমোস খালি প’ড়ে প’ড়ে
অকাতরে নাকে দিয়ে তৈল—
শোন রে আদেশ মোর
এই দণ্ডে আজি তোর
অষ্ট আনা জরিমানা হৈল।

হনুমান। (স্বগত) মোটে আট আনা?

বিভীষণ। তারপর, তোমাদের মতলব কি স্থির হল?

সুগ্রীব। এইবার সবাই মিলে রাবণ ব্যাটাকে

কিছু শিক্ষা দিতে হবে।

সকলে। হ্যাঁ! হ্যাঁ! ঠিক কথা! ঠিক কথা!

জাম্বুবানের নিদ্রা। সকলের গান

রাবণ ব্যাটায় মারো, সবাই রাবণ ব্যাটায় মারো
(তার) মাথায় ঢেলে ঘোল (ভারে) উল্টো গাধায় তোল
(তার) কানের কাছে পিটতে থাকো চোদ্দ হাজার ঢোল॥
কাজ কি ব্যাটার বেঁচে (তার) চুল দাড়ি গোঁফ চেঁচে
নস্যি ঢোকাও নাকে, ব্যাটা মরুক হেঁচে হেঁচে।
(তার) গালে দাও চুন কালি (তারে) চিমটি কাটো খালি
(তার) চৌদ্দপুরুষ উড়িয়ে দাও পেড়ে গালাগালি।
(তারে) নাকাল কর আরো যে যেরকম পারো
রাবণ ব্যাটায় মারো, সবাই রাবণ ব্যাটায় মারো॥

রামচন্দ্রের মূর্ছা ভঙ্গ ও গাত্রোত্থান

বিভীষণ। এই যে, শ্রীরামচন্দ্র গাত্রোৎপাটন করেছেন!

রাম। তারপরে—ওষুধপত্রের কি ব্যবস্থা কললে?

সকলে। ঐ যা! ওষুধপত্রের তো কিছু ব্যবস্থা হল?

রাম। মন্ত্রীমশাই গেলেন কোথা?

বিভীষণ। মন্ত্রীমশাই—একটা ঘুমোচ্ছেন।

সুগ্রীব। বাস! তবেই কেল্লা ফতে করেছেন আর কি!

সকলে। মন্ত্রীমশাই! আরে ও মন্ত্রীমশাই আহা একবার উঠুন না!

সকলে মিলিয়া জাম্বুবানকে ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাকি

বিভীষণ। বাবা! এ যে কুম্ভকর্ণের এক কাঠি বাড়া!

জাম্বুবান। (সহসা জাগিয়া) হ্যাঁরে, আমার

কাঁচা ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলি, ব্যাটা বেল্লিক, বেরসিক, বেআক্কেল, বেয়াদব—হাঁড়িমুখো ভূত!

সকলে। রাগ করবেন না—আহা রাগ করবেন না। কথাটা শুনুন।

সকলের গান

আজকে মন্ত্রী জাম্বুবানের বুদ্ধি কেন খুলছে না?
সঙ্কটকালে চটপট কেন মুক্তির কথা বলছে না?
সর্ব কর্মে অষ্টরম্ভা হর্দম পড়ে নাক ডাকছে—
উল্টে কিছু বলতে গেলে বিটকেল বিটকেল গাল পাড়ছে।
মরছে লক্ষ্মণ জানছে তব, দেখছে চেয়ে নিশ্চিন্তে
এম্নি প্রভাব ছিল না তার থাকতাম যখন কিষ্কিন্ধে!
হাঙ্গাম দেখে হটলে পরে নিন্দুক লোকে বলবে কি?
ভেবেই দেখ এম্নি করলে রাজ্যের কার্য চলবে কি?
মুখ্যু মোরা আক্কেল-শূন্য এক্কেবারেই বুদ্ধি নেই—
সূক্ষ্মযুক্তি বলতে কারো ঠাকুদ্দাদার সাধ্যি নেই।
বলছি মোরা কিচ্ছু নেইকো চটবার কথা এর মধ্যে
উঠে একবার ব্যবস্থা দেও প্রণাম করি ঠ্যাং পদ্মে॥

হনুমান। (স্বগত) হ্যাঁরে, আমার লেজে পাড়িয়ে দিলি?

রাম। বুঝলে হে জাম্বুবান, তুমি কিনা হচ্ছ প্রবীণ লোক—এ সম্বন্ধে নিশ্চয়ই তোমার খুব অভিজ্ঞতা আছে—

জাম্বুবান। আজ্ঞে হ্যাঁ—সে কথা আগে বললেই হত—তা না ব্যাটারা খালি ধাক্কাই মারছে—‘মন্ত্রীমশাই, আরে ও মন্ত্রীমশাই’

—আমি বলি বুঝি ডাকাত পড়ল নাকি?

রাম। হ্যাঁ, এইবার একটা কিছু ব্যবস্থা দিয়ে ফেল।

জাম্বুবান। (হনুমানের প্রতি) এই কাগজে যা প্রেশক্রিপশন লিখে দিচ্ছি, এই ওষুধগুলো চট করে নিয়ে আসতে হবে।

হনুমান। আচ্ছা, কাল ভোর না হতে উঠে নিয়ে আসব।

জাম্বুবান। না, না, এত দেরি করতে হবে না—এখুনি যা।

হনুমান। আবার এত রাত্তিরে কোথায় যাব? সাপে কাটবে না বাঘে ধরবে।

সুগ্রীব। ব্যাটা, সখের প্রাণ গড়ের মাঠ।

জাম্বুবান। না, ওষুধগুলো এখনি দরকার।

হনুমান। আঃ! হোমিওপ্যাথি লাগাও না।

জাম্বুবান। যা বলছি শোন্। এই যা গাছের কথা লিখলাম—বিশল্যকরণী মৃতসঞ্জীবনী—এই-সব গাছের শেকড় আনতে হবে।

হনুমান। আমি ডাক্তারখানা চিনি নে।

জাম্বুবান। আ মরণ আর কি! একি কলকাতার শহর পেয়েছিস নাকি যে বাথগেট কোম্পানি তোর জন্যে দোকান খুলে বসবে? কৈলাস পাহাড়ের কাছে গন্ধমাদন পাহাড় আছে জানিস তো?

হনুমান। কৈলেস ডাক্তার আবার কে?

জাম্বুবান। ব্যস! কানের পটহটা দেখি ভারি সরেস—ব্যাটা কৈলেস পাহাড় জানিস নে?

হনুমান। ও বাবা! সেই কৈলেস পাহাড়! এত রাত্তিরে আমি অত দূর যেতে পারব না।

জাম্বুবান। যাবি নে কি রে ব্যাটা? জুতিয়ে লাল করে দেব। এখনি যা—দেখিস পথে মেলা দেরি করিস নে।

হনুমান। আমার কান কটকট কচ্ছে—

রাম। আহা, যারে যা, আর গোল করিস নে—নে বকশিশ নে।

হনুমানকে রামচন্দ্রের কলা প্রদান

হনুমান। যো হুকুম!

[ কুর্নিশ করিতে করিতে হনুমানের প্রস্থান

জাম্বুবান। তারপর রাত্তিরের জন্য সেনাপতি নির্বাচন কর।

রাম। কেন? রাত্তিরে যুদ্ধ করবে নাকি?

জাম্বুবান। তা কেন? একজনকে একটা খবরদারি করতে হবে তো! তা ছাড়া, হয়তো লক্ষ্মণকে নিয়ে যমদূতগুলোর সঙ্গে ঝগড়া হতে পারে।

সকলে। তা তো বটেই! মন্ত্রীমশাই না হলে এমন বুদ্ধি কার হয়।

সুগ্রীব। (স্বগত) হ্যাঁ-হ্যাঁ, এইবার ভায়া বিভীষণকে কিঞ্চিৎ ফাঁপরে ফেলতে হচ্ছে—

সুগ্রীবের গান

আমার বচন শুন বিভীষণ
করহ গ্রহণ সেনাপতি পদ
(আহা) সাজ সজ্জা কর, দিব্য অস্ত্র ধর
সমরে সম্বর এ মহা বিপদ
(তুমি) বিপদে নির্ভীক বীর্যে অলৌকিক
তোমার অধিক কেবা আছে আর
(আহা) জলেতে পাষাণ যায় গো ভাসান
মুশকিলে আসান প্রসাদে তোমার—

সকলে। ঠিক কথা—উত্তম কথা।

বিভীষণ। তাই তো। মুশকিলে ফেললে দেখছি।

সুগ্রীব।
শুন সর্বজনে আজিকে এক্ষণে
বীর বিভীষণে কর সেনাপতি
(আহা) শ্রীরামের তরে সম্মুখ সমরে
যদি যায় মরে কিবা তাহে ক্ষতি?

সকলে। তা তো বটেই—কিচ্ছু ক্ষতি নেই।

জাম্বুবান। বেশ তো! তাহলে তাই ঠিক হল—খবরদার। দেখ, ভালো করে পাহারা দিও। কোন ব্যাটাকে পথ ছাড়বে না—স্বয়ং যম এলেও নয়। আর দেখো যেন ঘুমিও না।

[ বিভীষণ ব্যতীত সকলের প্রস্থান

বিভীষণ। ইকী গেরো! ভালো, আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়া গেল দেখছি!

বিভীষণের গান

বিধি মোর ভালে হায় কি লিখিল
আজ রাত্রে একি বিপদ ঘটিল।
দুর্মতি সুগ্রীব চির শত্রু মোর
ফেলিল আমারে সঙ্কটেতে ঘোর।
জাম্বুবান ব্যাটা কুবুদ্ধির ঢেঁকি
তার চক্রে পড়ি নিস্তার না দেখি।
আসে যদি কেহ রাত্রি দ্বিপ্রহরে—
ঠেকাব কেমনে একাকী তাহারে?
স্বর্গ হতে কহ দেবগণ সবে
আজি এ সঙ্কটে কি উপায় হবে?
যম হস্তে আজি না দেখি নিস্তার
সুযুক্তি তাহার কহ সবিস্তার
শুন দেবাসুর গন্ধর্ব কিন্নর—
মানব দানব রাক্ষস বানর।
শুন সর্বজনে মোর মৃত্যু হলে
শোকসভা করো তোমরা সকলে।

[ ইতি সমাপ্তোয়ং লক্ষ্মণের শক্তিশেলাভিধেয়স্য কাব্যস্য তৃতীয়ো সর্গঃ ]