লক্ষ্মণের শক্তিশেল (প্রথম দৃশ্য) · Lakshmaner Shaktishel (Scene One)
পাত্রগণ
রাম, জাম্বুবান, সভাসদগণ, বিভীষণ, লক্ষ্মণ, দূত, সুগ্রীব, হনুমান, বানরগণ, রাবণ, যমদূতদ্বয়, যম
প্রথম দৃশ্য
রামের শিবির
রাম। কাল রাত্তিরে আমি একটা চমৎকার স্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম কি, রাবণ ব্যাটা একটা লম্বা তালগাছে চড়ছে। চড়তে-চড়তে হঠাৎ পা পিছলে একেবারে—পপাত চ, মমার চ!
জাম্বুবান। তবে হয়তো রাবণ ব্যাটা সত্যিই-সত্যিই মরেছে—রাজস্বপ্ন মিথ্যা হয় না।
সকলে। হয় না, হবে না—হতে পারে না।
রাম। আমি হনুমানকে বললুম, যা, ব্যাটাকে সমুদ্রে ফেলে দিয়ে আয়। হনুমান এসে বললে কি, ফেলবারও দরকার হল না সে এক্কেবারে মরে গেছে।
সকলে। বাঃ বাঃ।—একদম মরে গেছে—ব্যাস। আর চাই কি, খুব ফুর্তি কর!
বাহিরে গোলমাল
ঐ দেখ রাবণের রথ দেখ। যাচ্ছে দেখেছিস? ঐটা রাবণ, ঐ যে লাঠি কাঁধে—
সকলে। সে কি! রাবণ ব্যাটা তবু মরে নি ব্যাটার জান তো খুব কড়া!
জাম্বুবান। এই হনুমান ব্যাটাই তো সব মাটি কললে—তখন রাবণকে সমুদ্রে ফেলে দিলেই গোল চুকে যেত—না, ব্যাটা আবার বিদ্যে জাহির করতে গিয়েছে—‘এক্কেবারে মরে গেছে’—
বিভীষণ। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে—
দূতের প্রবেশ
সকলে। কি হে, খবর কি?
দূত। আজ্ঞে, আমি এইমাত্র আসছি—
লক্ষ্মণ। ব্যস! মস্ত খবর দিয়েছ আর কি!
জাম্বুবান। এইমাত্র আসছ? তোপ ফেলতে হবে?
রাম। আজ কি ঘটল না ঘটল সব ভালো করে গুছিয়ে বল।
দূত। আজ্ঞে, আমি ছান-টান করেই পুঁইশাক চচ্চড়ি আর কুমড়ো ছেঁচকি দিয়ে চাট্টি ভাই খেয়েই অমনি বেরিয়েছি—অবিশ্যি আজকে পাঁজিতে কুষ্মাণ্ড ভক্ষণ নিষেধ লিখেছিল, কিন্তু কি হল জানেন আমার কুমড়োটা পচে যাচ্ছিল কিনা।
সকলে। বাজে বকিস নে কাজের কথা বল।
দূত। হ্যাঁ হ্যাঁ খেয়ে উঠেই ঘণ্টা দু’তিন জিরিয়ে সেখানে গিয়ে দেখি খুব ঢাক ঢোল বাজছে ধ্যা র্যা র্যা র্যা র্যা র্যা ধ্যা রা রা রা ধ্যারা
সকলে। মার ব্যাটাকে মার ব্যাটার কান কেটে দে!
জাম্বুবান। ব্যাটার ধ্যারারারা চলেছে যেন রেকারিং ডেসিমাল
সুগ্রীব। ব্যাটা, তুই ভালো করে ধারাবাহিক-রূপে আদ্যোপান্ত পর্যায় পরম্পরা সব বলবি কি না?
রাম। তারপরে কি হল শুনি ততঃ কিম্?
দূত।
(গান) আসিছে রাবণ বাজে ঢক্ক ঢোল,
মহা ধুমধাম মহা হট্টগোল।
সকলে।
ততঃ কিম্, ততঃ কিম্, ততঃ কিম্?
দূত।
শঙ্খ হুলাহুলি শানাই নিঃস্বন
কর্তাল ঝঙ্কার অস্ত্রের ঝনন।
সকলে। ততঃ কিম্, ততঃ কিম্, ততঃ কিম্?
দূত। লাখো লাখো সৈন্য চলে সাথে সাথে
উড়িছে পতাকা সমুখে পশ্চাতে!
সকলে। ততঃ কিম্, ততঃ কিম্, ততঃ কিম্?
দূত। বীর দর্পে সবে করে কোলাহল
মহা আস্ফালনে কাঁপে ধরাতল।
সকলে। ততঃ কিম্, ততঃ কিম্, ততঃ কিম্?
দূত। তাহাদের রুদ্র দাপটের চোটে
ভয়ে প্রাণ উড়ে পিলে চমকে ওঠে।
সকলে। ততঃ কিম্, ততঃ কিম্, ততঃ কিম্?
দূত। আজি দুর্দিনেতে নাহি কারো রক্ষা।
দলে বলে সবে পাবে আজি অক্কা।
জাম্বুবান। চোপরাও বেয়াদব! মুখে সামলে কথা বলিস।
রাম। তুমি রাবণকে দেখেছ, এখান থেকে কত দূরে?
দূত। আজ্ঞে, এখেন থেকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা।
সকলে। হ্যাঁ—হ্যাঁ—পাঁচ ঘণ্টা, না পঁচিশ ঘণ্টা!
দূত। আজ্ঞে একটু দ্রুত হাঁটলে পোয়া ঘণ্টায় হতে পারে।
জাম্বুবান। তুমি কি করে আসছিলে? হামাগুড়ি দিয়ে?
রাম। কোন্দিকে আসছিল, বল তো?
দূত। আজ্ঞে, তা তো জিগগেস করি নি!
সকলে। ব্যাটা! তুমি আছ কোন্ কর্মে?
রাম। তাড়াতাড়ি আসছিল, না আস্তে আস্তে?
দূত। আজ্ঞে, তাড়াতাড়ি—আস্তে আস্তে। আজ্ঞে সেটা ঠিক ঠাওর করে দেখি নি!
সকলে। এটা কোথাকার অপদার্থ রে? দে, ওটাকে তাড়িয়ে দে।
বিভীষণ। (জাম্বুবানের প্রতি) মন্ত্রীমশাই! একটা কথা শুনুন! কানে-কানে বলব—
জাম্বুবান। উঃ-দূৎ! বনমানুষ কোথাকার! তোর দাড়িতে ভারি গন্ধ! শুনব না—
দূত। হাঃ—হাঃ—হাঃ—হাঃ—হাঃ
বিভীষণ। বেটা হাসছিস কেন রে বেয়াদব?
বিভীষণের দূতকে প্রহার ও অর্ধচন্দ্র
সুগ্রীব। ওরে, কে কোথায় আছিস? আমার গদাটা নিয়ে আয় তো।
সকলে। কেন? গদা কেন?
সুগ্রীব। রাবণকে ঠ্যাঙাব!
হনুমানের প্রবেশ
হনুমান। রাবণ বোধ হয় আসছে!
সকলে। যা—যা, ব্যাটা এতক্ষণে এক বাসি সংবাদ নিয়ে এসেছে!
সুগ্রীব। চল হে লক্ষ্মণ, আমরা যুদ্ধ করি গিয়ে—
[ সকলের উত্থান ও প্রস্থান
[ ইতি সমাপ্তোয়ং লক্ষ্মণের শক্তিশেলাভিধেয়স্য কাব্যস্য প্রথমো সর্গঃ ]