ঝালাপালা (দ্বিতীয় দৃশ্য) · Jhalapala (Scene Two)
দ্বিতীয় দৃশ্য
জমিদার বাড়ি
দুলিরাম ও খেঁটুরামের প্রবেশ
দুলিরাম এত কাণ্ডকারখানা করা গেল, এখন ভালোরকম দু-একটা ওস্তাদ আসে তবে মজলিসটা জমে।
খেঁটুরাম হ্যাঁ। বেশ তালে আছি দাদা! ভাবনা নেই, চিন্তা নেই, খাওদাও আর ফুর্তি কর।
দুলিরাম হ্যাঁ হ্যাঁ, যেরকম ঘি-দুধ চর্বচোষ্য চলছে, আর কটা দিন যেতে দাও না—আর চেনবার জো থাকবে না।
কেবলচাঁদের প্রবেশ
কেবল আমি মনে কচ্ছিলুম আপনাদের মজলিসে আজ গুটি দশেক গান শোনাব।
খেঁটুরাম ও দুলিরাম (পরস্পরের প্রতি) এ কে রে?
কেবল সিকী! আপনারা কেবলচাঁদ ওস্তাদকে চেনেন না?
খেঁটুরাম কোন জন্মে নামও শুনি নি—
দুলিরাম চোদ্দপুরুষে কেউ চেনে না—
কেবল হ্যাঁ, তা আপনারা গোপীকেষ্ট-বাবুকে চেনেন তো?
খেঁটুরাম গোপীকেষ্ট?
দুলিরাম ও খেঁটুরাম হ্যাঁ—নাম শুনেছি—বোধ হচ্ছে।
কেবল আমি গোপীকেষ্টবাবুর বাড়িওয়ালার খুড়শ্বশুরের জামাইয়ের পিসতুতো ভাই।
দুলিরাম তাই নাকি!
খেঁটুরাম সে কথা বলতে হয়—আসতে আজ্ঞা হোক মশাই।
দুলিরাম বসতে আজ্ঞা হোক মশাই—
খেঁটুরাম কি নামটা বললেন আপনার?
কেবল কেবলচাঁদ।
দুলিরাম কি বললে? বক্কেশ্বর? তা বেশ বকদাদা, আজ তোমার গান শোনা যাবে!
কেবল তা বেশ, কি বলেন—গানটা আরম্ভ করলে হয় না?
খেঁটুরাম না, না! এখনই কি দরকার? সবাই আসুক আগে—
কেবল এই সুর-টুরগুলো একটু গুছিয়ে নিতে হবে।
দুলিরাম। আরে মশাই! আমাদের কাছে ‘গা’-ও যা, ‘ধা’-ও তাই—সবই সমান।
কেবল। হ্যাঁ—গানগুলোর কি মুশকিল জানেন? গুগুলো আমার স্বরচিত কিনা—তাই, গাইতে একটু সংকোচ বোধ কচ্ছি।
খেঁটুরাম। তা নাই-বা গাইলে—অন্য কিছু গাও না—
কেবল। আ মোলো যা! এরা আমায় গাইতে দেবে না দেখছি, আমার ভালো-ভালো গানগুলো—
কেষ্টা ও ঘটিরামের প্রবেশ
ঘটিরাম। আমরা গান শুনতে এলুম।
কেষ্টা। কই রে, লোকজন সব কই? গাইবে কে? আপনি বুঝি?
কেবল। হ্যাঁ হ্যাঁ, তা এঁরা যখন নেহাত পেড়াপীড়ি কচ্ছেন তখন না গাইলে সেটা ভয়ঙ্কর খারাপ দেখাবে।
কেবলচাঁদ গুন গুন করিতে-করিতে সহসা সপ্তমে চিৎকার
খেঁটুরাম। রক্ষে কর দাদা, এ অত্যাচার কেন?
দুলিরাম। মশাই, এটা ‘ডেফ্ অ্যাণ্ড ডাম্ব্’ ইস্কুল নয়—আমাদের কানগুলো বেশ তাজা আছে।
কেবল। আজ্ঞে, সুরটা ঠিক আন্দাজ পাইনি—একটু চড়ে গিয়েছিল—না?
দুলিরাম। একটু বলে একটু?
খেঁটুরাম। রীতিমত তেড়ে এসেছিল।
কেবল। আচ্ছা, একটু নামিয়ে ধরি—
কেবলচাঁদের গান
আহা, পড়িয়া কালের ফেরে মোরা কি
হনু রে?
কোথায় ভীষ্ম কোথা দ্রোণ
কোথা কর্ণ ভীমার্জুন
কোথায় গেলেন যাজ্ঞবল্ক্য কোথায়-বা সে
মনু রে?
মাটির সঙ্গে মিশছে সবি
কেঁচোর মতো খাচ্ছে খাবি।
কেবল আপিস খাটি কচ্ছে মাটি নধরপুষ্ট
তনু রে—
ব্রাহ্মণের সে তেজ নাই
হ্যাঁ হ্যাঁ ব্রাহ্মণের সে—
কেবলচাঁদের মাথা চুলকানো
দুলিরাম। শিঙ নাই আর লেজ নাই—
কেবল। হ্যাঁ হ্যাঁ—
কেবলচাঁদের গান
ব্রাহ্মণের সে তেজ নাই
খাদ্যাখাদ্য ভেদ নাই
মনের দুঃখ কারে বলি মোরা কি হনু
রে—
আহা পড়িয়া কালের ফেরে মোরা কি
হনু রে।
খেঁটুরাম। দাঁড়ান একটু সামলে নি—অতো করুণ রস করবেন না।
খেঁটু ও দুলি ক্রন্দনোম্মুখ। কেষ্টা ও ঘটিরামের উচ্চহাস্য
খেঁটুরাম। তবে রে ছোকরা! তোরা হাসছিস কেন?
ঘটিরাম। বাঃ! হাসি পেলে হাসব না?
দুলিরাম। হাসি পাবে কেন? এখানে হাসবার কি হল?
খেঁটুরাম। ছ্যাবলামি পেয়েছিস? কথা নেই বার্তা নেই—হ্যাঃ-হ্যাঃ!
ঘটিরাম। কি রে কেষ্টা, হাসি পেলে হাসব না?
কেষ্টা। এই রে, পণ্ডিতমশাই আসছে—
ঘটিরাম ও কেষ্টা। এই রেঃ, এই রেঃ, এই রেঃ, পণ্ডিতমশাই আসছে—মাটিং চকার—তোর র্যাপারটা দে তো।
ঘটিরাম ও কেষ্টার র্যাপার মুড়ি হইয়া উপবেশন।
পণ্ডিতের প্রবেশ
পণ্ডিত। ভালো, ভালো! তোমরা মধ্যেমধ্যে বিশ্রাম নিতে পার না? নিত্যিনিত্যি জমিদারমশাইকে বিরক্ত করাটা কি ভালো দেখায়?—ইকী! ক্যাবলাটা এখানে এয়েছে কি করতে? (দুলিরাম ও খেঁটুরামের প্রতি) আমোলা যা! তোমাদের যত রাজ্যের ইয়ার-বকশী সব বুঝি জোটাচ্ছ একে-একে?
কেবল। দেখলেন মশায়? আমাকে অপমান কললে। আমায় ইয়ার-বকশী বললে, অমন কললে কিন্তু আমি গাইব না।
পণ্ডিত। তা নাই-বা গাইলে—কে তোমাকে মাথার দিব্যি দিচ্ছে? যা না গান! গানের ধমকে আমাদের পযন্ত পিলে চমকে ওঠে—তা, অন্যে পরে কা কথা!
ছাতা ও বিশাল পুঁটলি লইয়া রামকানাইয়ের প্রবেশ
রামকানাই। (ঘটিরাম ও কেষ্টার প্রতি) আপনাদের কি হয়েছে? অমন করে বসে আছেন যে? কাশি? জ্বর? ন্যাড়া মাথা? ঠাণ্ডা লাগবে বলে?
পণ্ডিত। (ঘটিরাম ও কেষ্টার প্রতি) কি হে, এখানে এসে হাজির হয়েছ? আচ্ছা বেরিয়ে নাও তারপর—
রামকানাই কর্তৃক পণ্ডিতস্কন্ধে পুঁটলি স্থাপন
তুমি কি রকম মানুষ হে?
রামকানাই। কেন? বেশ দিব্যি মানুষটি।
পণ্ডিত। বলি চোখ দিয়ে দেখতে পাও না কি?
রামকানাই। চোখ দিয়ে দেখতে পাই না তো কি কান দিয়ে দেখতে পাই?
পণ্ডিত। না হে, তুমি বড় বাচাল—শাস্ত্রে বলেছে—
রামকানাই। না—শাস্ত্রে আমার সম্বন্ধে কিছু বলে নি—
পণ্ডিত। আহা, বলি, তোমায় তো কেউ এখেনে ডাকে নি?
রামকানাই। ডাকবে আবার কি? এ কি নিলেমের মাল পেয়েছ যে ডাকাডাকি করবে?
পণ্ডিত। হ্যাঁ, তবে অমন করে বসে থাকলে তো ভালো দেখায় না।
রামকানাই। ভালো দেখায় না কি হে? তোমাকে যে অশথগাছের মামদো ভূতের মতো দেখা যায়, সে বেলা কি?
পণ্ডিত। আহা, বলি, যদি কিছু বলবার
থাকে, তা ঝটপট বলে বাড়ি যাও-না কেন?
রামকানাই। হ্যাঁ, তাহলে তুমিও আমার পুঁটলিটা সরাবার সুবিধা পাও।
পণ্ডিত। কি আপদ! বলি পুঁটলিটা রেখে যেতে বললে কে? নিয়েই যাও-না কেন?
রামকানাই। মুটের পয়সা দেবে কে?
পণ্ডিত। হাঃ—মুটের পয়সা দেবে কে? মুটের পয়সা দেবে!
রামকানাই। উঃ! দূৎ! তোমার ময়লা চাদরটা আমার নাকের কাছে নেড়ো না।
জমিদারের প্রবেশ
খেঁটুরাম। সর সর, জমিদারমশাই আসছেন।
দুলিরাম। হ্যাঁ, হ্যাঁ, সর, সর।
জমিদার। কি রে! রামা কখন এলি? বেশ, বেশ, ভালো আছিস তো?
রামকানাই। (প্রণাম করিয়া) আজ্ঞে এই মাত্র আসছি—
পণ্ডিত। আপনার এই লোকটা ভারি উদ্ধতস্বভাব—কথা বলে যেন তেড়ে মারতে আসে।
জমিদার। ওরে রামা! বাবুদের কিছু বলিস টলিস নে।
রামকানাই। যে আজ্ঞে।
জমিদার। ও আমার বহুকেলে পুরোনো চাকর কিনা—কারুর কথা-টথা বড় শোনে না। তবে লোকটা ভালো—দেশে গিছিল, আজ বহুকাল পরে এল।
খেঁটুরাম। ইনি হচ্ছেন কেবলচাদ ওস্তাদ—
দুলিরাম। মস্ত গাইয়ে।
খেঁটুরাম। আশ্চর্য! যত ওস্তাদ এসেছিল, ওঁর চেহারা দেখেই দে চম্পট।
দুলিরাম। তা হবে না? এঁরই গান শুনে আমাদের নবাবসাহেব মুর্ছা গেছিলেন, এঁরই গান শুনবার জন্য কিষাণবাবু তেতাল্লিশ মাইল পথ হেঁটে গেছিলেন—
খেঁটুরাম। একে সভায় রাখতে কত রাজা বাদশা হদ্দ হল।
দুলিরাম। কত টাকাকড়ির শ্রাদ্ধ হল।
খেঁটুরাম। কত ওস্তাদ গাইয়ে জব্দ হল।
পণ্ডিত। ওহে, বেশি বাড়িয়ে কাজ কি? আমাদের ন্যায়শাস্ত্রে বলেছে—অলমতিবিস্তারেন—বেশি বাড়াতে নেই।
খেঁটুরাম। আমি অনেক হাঙ্গামা করে তবে ওঁকে এনেছি।
দুলিরাম। তুই এনেছিস? দেখলেন মশাইরা, কাজ করব আমি, আর বাহাদুরি নেবেন উনি!
খেঁটুরাম। খবরদার!
দুলিরাম। চোপরও!
খেঁটুরাম। ফের!
পণ্ডিত। সমাশ্বসীহি, সমাশ্বসীহি, জমিদারমশায়ের সামনে এমন গর্হিত আচরণ করতে নেই! আহা! সঙ্গীতশাস্ত্র-রসানভিজ্ঞ, সঙ্গীত আর ন্যায়শাস্ত্র বুঝলেন কিনা—অতি উপাদেয় জিনিস! আমাদের ন্যায়-শাস্ত্রে বলেছে—অদ্ভুত-তদ্ভাবে চ্বী সে এক অত্যদ্ভুদ্, ব্যাপার—
জমিদার। তাহলে গান আরম্ভ হোক। ওস্তাদজি আপনি মাঝে-মাঝে আমাদের গান-টান শোনাবেন—
কেবল। হ্যাঁ, তা, শোনাব বৈকি অবিশ্যি এর দরুন আমার সব কাজকর্মের বড্ড ভয়ঙ্কর ক্ষেতি হবে, কিন্তু তা হোক—
পণ্ডিত। আরে ছো, ছো! তুমি তো ভারি ছোটলোক হে। এই সামান্য কাজটুকু করতেও তোমাদের যত রাজ্যের আপত্তি! আজ যদি জমিদারমশাই আদেশ করেন, এখেনে একটা টোল খুলতে হবে—আমার একশো কাজ থাক, হাজার কাজ থাক, আমি অমনি টোল খুলেতে লেগে যাব। কেন? না, এটা আমাদের কর্তব্য। আমাদের উচিত যে ওঁর খাতিরে কিছু ত্যাগ স্বীকার করি, হোকগে ক্ষেতি, তাতে কি? বিশ্বাস হচ্ছে না? রামা! যাও তো, এখনি একটা লোক পাঠিয়ে আমার জিনিসগুলো ধাঁ করে আনিয়ে দাও তো—চণ্ডী জমিদারমশায়ের সম্মান রাখতেই হবে।
জমিদার। কিন্তু এখেনে জায়গার যে বড় অসুবিধে—
পণ্ডিত। কিচ্ছু না, কিচ্ছু না—ওর মধ্যেই সুবিধা করে নেব। বুঝলেন চণ্ডীবাবু, আপনি আমার জন্যে চিন্তিত হবেন না। রামা!
রামকানাই। আবার কেন?
পণ্ডিত। ঐ বাইরের বড় ঘরটায় আমার বন্দোবস্ত করে দাও তো।
রামকানাই। সেখেনে দেখলুম দুটি বাবু বসে আছেন।
দুলিরাম। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার গাঁয়ের লোক। আপনার বাগানটা দেখলাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—তাই ওদের বলে কয়ে এনেছি; ওরা এ বিষয়ে একেবারে এক্স্পার্ট। মাইনের জন্য ভাববেন না—পঞ্চাশ টাকা দিলেই হবে।
পণ্ডিত। যা! বাবুদের হটিয়ে দে। বলগে ওখেনে টোল বসবে।
দুলিরাম। সিকী! আমার গাঁয়ের লোক! হবু গ্রামের অপমান!
পণ্ডিত। আরে না, না—রামা, দেখিস যেন বাবুদের ধমক-ধামক করিস নে—জমিদার মশায়ের যাতে অখ্যাতি না হয়—মিষ্টি করে বলবি। আর দেখ্ (গলা নামাইয়া) নেহাত যদি না শোনে ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে দিস।
খেঁটুরাম। শোন্—ঘর-টর দিয়ে কাজ নেই—জিনিসপত্রগুলো এনে উঠোনে ফেলে রাখিস—
পণ্ডিত। আর দেখ্—ঐ শব্দকল্পদ্রুমখানা আনতে ভুল হয় না যেন—আর কয়েকখানা মূল্যবান বই আছে—
দুলিরাম। যেমন কথামালা ধারাপাত—
পণ্ডিত। সেগুলো হারায় না যেন—
কেবল। হ্যাঁ—সেই গানের কথাটা চাপা পড়ে গেল—
রামকানাই। হ্যাঁ, হ্যাঁ, গানটা হয়ে যাক—তারপর যাব এখন।
কেবল। এখানে বাজিয়ে কেউ নেই?
রামকানাই। আমি বাজাতে পারি—দাও তো পাখওয়াজটা—ধত্তেরে কেটে তাগ ঘ্ড়ান্ ঘ্ড়ান্ নাগে নাগে নাগে নাগে—নাগে দেৎ ঘেঘে তেটে ঘেঘে তেটে ঘেঘে তেটে কই! গান আসছে না বুঝি?
পণ্ডিত। ইকী! চাকরটা এরকম করে কেন?
জমিদার। পুরোনো লোক কিনা! রামা তুই এখন চুপ কর—বাবুদের বাধা দিস নে।
রামকানাই। যে আজ্ঞে!
কেবলচাঁদের গান
তানানা তাইরে নারে—তারে না তাইরে
নারে—তারে না তাইরে নাইরে—না-তানা-
ন্না—
রামকানাই। এই যা! তাল কেটে গেল!
কেবল। আর কেন? থামো না বাপ!
রামকানাই। কেন মশাই? থামব কেন? নাগেদেৎ ঘেঘেতেটে ঘেঘে তেটে ঘেড়ে নাগ তেরে কেটে দেৎ—দ্রেগে দ্রেগে দ্রেগে—
পণ্ডিত। ওহে, জমিদারমশায়ের সামনে অমন করতে নেই—আমাদের ন্যায়শাস্ত্রে বলেছে—ণত্বমিচ্ছন্তি বর্বরাঃ—বুঝলে কিনা।
জমিদার। রামা, তুই একটু কাজে যা—পুরোনো মানুষ কিনা!
দুলিরাম। হ্যাঁ, ওস্তাদজি—ঐ যে গাইলেন ওটা কি তাল বলছিলেন?
কেবল। ওটা—ওটা হচ্ছে মাদ্রাজী একতালা।
খেঁটুরাম। সবে একতালা? আহা, যখন চৌতালায় উঠবে—তখন না জানি কেমন হবে!
রামকানাই। তখন সব কানে তালা লেগে যাবে।
পণ্ডিত। হ্যাঁ ওস্তাদজি, তাহলে আপনার গানটা শিগগির শেষ করে ফেলুন—আহা অতি উচ্চাঙ্গের সংগীত!
রামকানাই। ভারি উচ্চাঙ্গ! সেই আমাদের একজন যা ইমনকল্যাণের আলাপ করেছিল—সেটা পুরোপরি শিখতে পারি নি। যেটকু শিখেছি শুনবেন? আ—আ—আ—
কেউ কেউ কেউ।
জমিদার। রামা!
রামকানাই। যে আজ্ঞে।
[ রামকানাইয়ের দ্বার পর্যন্ত প্রস্থান
কেবলচাঁদের গান
কেবল। হায় রে সোনার ভারত—
ঘটি ও কেষ্টার উচ্চহাস্য
ঘটিরাম। হাসিয়ে দিলি যে?
কেষ্টা। হাসিয়ে দিচ্ছিস কেন রে?
ঘটিরাম। তুই তো আগে হাসছিলি—
কেষ্টা। যাঃ! আমি কখন হাসলাম—
কেবল। দেখলেন মশায়! গম্ভীর বিষয়, এর মধ্যে কি কাণ্ডটা কললে!
খেঁটুরাম। রামা! একে সটাং রাস্তা পার করে দিয়ে আয় তো—
রামকানাই। (ওস্তাদকে ধরিয়া) একে?
[ ঘটিরাম ও কেষ্টার প্রস্থান
কেবল। এইও, ইস্টুপিট বেয়াদোব, ভদ্রলোকের গায়ে হাত তুলিস্!
পণ্ডিত। ইকী! ইকী! কাকস্য পরিবেদনা, গতস্য শোচনা নাস্তিক!
জমিদার। রামা, তুই একটু কাজে যা দেখি—তুই আমার নাম ডোবাবি দেখছি।
[ রামকানাইয়ের প্রস্থান
কেবলচাঁদের আবার গান আরম্ভ
কেবল।
হায় রে সোনার ভারত দুর্দশাগ্রস্ত হইল
অবসাদ হিমে ডুবিয়ে ডুবিয়ে ধুলোয়
পতিত রইল
যে দেশের শ্রেষ্ঠতার এত সব ভূরি ভূরি
প্রমাণ বর্তমান
আজকাল তাকেই কিনা—সব অবজ্ঞা
করিতেছে—
এবং দেখাচ্ছে সবাই মর্তমান
কোথা সেই তিরিশ কোটি আটানব্বই
লক্ষ
সাড়ে চোদ্দ হাজার মাতৃভক্ত ভারত
সন্তান
সহ্য হবে না হবে না তাদের হৃদয়ে
সবাই জাগো জাগো উঠে পড়ে লাগো
দেশোদ্ধারে ব্রতী হও হে!
দুলিরাম। এই! সিডিশাস্!
পণ্ডিত। অ্যাঁ, কি বললে? রাজদ্রোহসূচক? অ্যাাঁ?
খেঁটুরাম। তবে রে! সিডিশাস্ গান কচ্ছিস কেন রে?
দুলিরাম। জানিস, আমার মামাতো ভাই গবর্মেণ্টের চাকরি করে।
খেঁটুরাম। হ্যাঁরে, ওর মামাতো ভাইয়ের চাকরি ঘোচাবি কেন রে?
কেবল। আমি তো জানতুম নে—আমি তো জানতুম নে—
পণ্ডিত। জানতি নে কিরে? কেন জানতি নে?
পণ্ডিতের কেবলচাঁদকে প্রহার
কেবল। কী! মারলি কেন রে? ফের মার দেখি!
পণ্ডিতের কেবলচাঁদকে পুনঃপ্রহার
এবার মারবি তো একেবারে—
পণ্ডিতের কেবলচাঁদকে পুনঃপ্রহার
উঃ! এত জোরে মারলি কেন রে ইস্টুপিট! দাঁড়া দেখাচ্ছি—
[ কেবলচাঁদের পলায়ন
পণ্ডিত। যা না গাইলেন! গলা শুনলে ছত্রিশ রাগিণী ছাটে পালায়।
দুলিরাম। ওর পেটের মধ্যে ডুবুরি নামালে, গানের ‘গ’টা মেলে কিনা সন্দেহ!
পণ্ডিত। তোমরা কোত্থেকে এ-সব আপদ জোটাও হে? জমিদারমশায়ের খ্যাতি প্রতিপত্তির দিকে কি তোমাদের একটু ও দৃষ্টি নেই?
খেঁটুরাম। এই দুলিরামটাই তো যত নষ্টের গোড়া, যত রাজ্যের অঘামারা রোথো লোক
ডেকে আনবে!
দুলিরাম। বিলক্ষণ। আমি ডেকে আনলাম? আমার সাতজন্মে ওর সঙ্গে আলাপ নেই।
খেঁটুরাম। এত করে বারণ কল্লুম, তবু ডেকে আনলে!
দুলিরাম। না, মশাই! ও নিজে ডেকে এনেছে আমি আদবে কিছু জানি নে!
পণ্ডিত। জানো না তো জানো না—তা অত গরম হবার দরকার কি? আমাদের ন্যায়শাস্ত্রে বলেছে—উষ্ণত্বমগ্ন্যাতপসং-প্রয়োগাৎ—
জমিদার। এবারে গরমটা কেমন টের পাচ্ছ বল দেখি—
খেঁটুরাম। আঃ! গরম বলে গরম! আগুন লাগে কোথা! উঃ!
দুলিরাম। আমাদের বেড়ালটা সর্দি-গর্মি হয়ে মারা গেছে—
জমিদার। এ-সব বোধ হয় সেই ধূমকেতুর জন্যে—
পণ্ডিত। হ্যাঁ, সিদিন আমাদের ওখেনে ধূমকেতুর ন্যাজ দেখা গিছিল—
দুলিরাম। কার ন্যাজ কে জানে?
খেঁটুরাম। ওঁরই ন্যাজ হয়তো।
জমিদার। ধমকেতুটা এসে কি কাণ্ডই কল্ল? ঝড়, বৃষ্টি, ভূমিকম্প—
খেঁটুরাম। প্লেগ, দুর্ভিক্ষ, বেরিবেরি—
দুলিরাম। পানের পোকা, এলাহাবাদ একজিবিশান!
পণ্ডিত। আমি শুনেছি ঐ পানের পোকার খবরটা নাকি সত্যি নয়!
খেঁটুরাম। আলবাৎ সত্যি! নন্দলাল ডাক্তার স্বচক্ষে দেখেছে লোকে পান খাচ্ছে আর মরছে!
জমিদার। ঈস্! বল কি হে? তাহলে তো কাথাটা সত্যি বলতে হবে।
পণ্ডিত। হ্যাঁ—দূরবীন দিয়ে সে পোকা দেখা গেছে—
খেঁটুরাম। কলকেতার সায়েব ডাক্তার বলেছে তার ভয়ঙ্কর তেজাল বিষ।
দুলিরাম। হ্যাঁ—আমি দেখিছি, সাদা মতন আবার ন্যাজ আছে। কার ন্যাজ কে জানে?
রামকানাইয়ের দ্রুত প্রবেশ
রামকানাই। এই রে সেই দাড়িওয়ালা! সেই দাড়িওয়ালা বাবুটা আমায় তেড়ে এসেছিল! উঃ!
সকলে। কি হয়েছে! কি হয়েছে?
রামকানাই। সেই বাইরের ঘরের বাবুরা—উঃ—আমায় বেদম মারপিট করেছে! একজন ছাগলদাড়ি বাবু আছে, সে আমায় দেখেই হঠাৎ ছাতের সমান লাফ দিয়ে তেড়ে এসেছিল—উঃ!
পণ্ডিত। সিকী রে! তুই করেছিলি কি?
রামকানাই। আমি তো কিচ্ছু করি নি—আমি বললাম, এখেনে ঢোল বসবে, বাবুরা যদি একটু, অন্যত্তর যান, নেহাত যদি না যান, আপনাদের ঘাড়ে ধাক্কা দেওয়া হবে।
দুলিরাম। কি! ভদ্রলোককে এমনি করে ইনসাল্ট্!
খেঁটুরাম। যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা! রামকানাই। আমি তো মিষ্টি করে বলেছিলুম—
খেঁটুরাম। ব্যাটা, তোমায় মিষ্টি জুতো না দিলে তুমি সিধে হবে না—
পণ্ডিত। আমার জিনিসপত্রগুলো কি কল্লি?
রামকানাই। ঐ যে, বাইরের উঠোনে ফেলে রেখেছি!
পণ্ডিত। দেখলেন মশাই, কাণ্ডটা দেখলেন?
রামকানাই। এই বাবুটি যে বললেন!
পণ্ডিত। যা, যা, যেখানে হয় শিগগির বন্দোবস্ত করে দে! আমাদের ন্যায়শাস্ত্রে এক জায়গায় এমনি লিখেছে—
রামকানাই। বলি ন্যায়শাস্ত্র শুনলে তো আর পেট ভরবে না! তোমরা কি এইখেনে বসেই রাত কাবার করবে নাকি? জমিদারমশায়ের কি আর খাওয়া-দাওয়া নেই?
জমিদার। ওরে রামা অমন করে বলতে নেই—বাবুদের মান্য করে কথা বলিস—আর পণ্ডিতমশাইকে কি চোখ রাঙায়?
রামকানাই। যে আজ্ঞে, প্রাতঃ প্রণাম পণ্ডিতমশাই!
পণ্ডিত। রামা, নেতাইবাবুর বাড়ি আমার দুই পোড়ো থাকে, তাদের খবর দিস তো।
[ পণ্ডিত, খেঁটুরাম ও দুলিরামের প্রস্থান
জমিদার। রামা, দেখছিস তো কাণ্ডটা?
রামকানাই। আজ্ঞে হ্যাঁ—
জমিদার। উৎপাত যে বেড়ে চলল—কি করা যায়?
রামকানাই। আজ্ঞে, হুকুম পেলেই সব সাফ করে দি।
জমিদার। না, না, ওরা আপনা থেকে উঠে যায়, এমন কিছু, করা যায় না? অথচ আমার নিন্দেটা না হয়!
রামকানাই। তাহলে ওদের ঘরে লঙ্কার ধোঁয়া দিলে হয় না?
জমিদার। দূৎ! এটাকে কিছু জিগগেস করাই ঝকমারি! যা, তুই এক কাজ কর—আমার মামার বাড়ি যা। সেখেন থেকে কেদারমামাকে ডেকে আনবি—তাকে সব বলে কয়ে আনিস!
রামকানাই। যে আজ্ঞে—
জমিদার। মামা এলেই সব সিধে করে দেবে—উকিলে বুদ্ধি কিনা!
গান
নাছোড়বান্দা নড়েন না!
উড়ে আসেন, জড়ে বসেন,
মাথায় কেন চড়েন না!
নাছোড়বান্দা নড়েন না!
যাবার নামটি করেন না,
ধাক্কা দিলে সরেন না!
নাছোড়বান্দা নড়েন না!
কচ্ছে সবাই যা’চ্ছা তাই!
চাকর ব্যাটা দিচ্ছে গালি,
হাঁ করে সব খাচ্ছে তাই!
কচ্ছে সবাই যা’চ্ছা তাই
আসছে যে-কেউ পাচ্ছে ঠাঁই,
ইকিরকম হচ্ছে ভাই?
কচ্ছে সবাই যা’চ্ছা তাই!